SSC Chemistry || এসএসসি রসায়ন || অধ্যায়ঃ ১২ _ আমাদের জীবনে রসায়ন (কনসেপ্ট নোট )



অধ্যায়
১২
আমাদের জীবনে রসায়ন
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সকল ক্ষেত্রে রসায়নের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আমরা ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ব্রাশে একটু পেস্ট লাগিয়ে দাঁত মাজি। তারপর অনেকেই সকালের নাস্তায় কেক, পাউরুটি খেয়ে থাকি। আবার, টয়লেট ক্লিনার দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার করি। গোসল করার সময় আমরা ব্যবহার করি সুগন্ধি সাবান আর শ্যাম্পু। এছাড়াও কৃষক তার জমিকে উর্বর করার জন্য ব্যবহার করে রাসায়নিক সার। উৎপাদিত শস্য ও খাদ্যকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য প্রিজারভেটিভস জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে থাকি। অর্থাৎ, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত পেস্ট, কেক, পাউরুটি, টয়লেট ক্লিনার, সাবান, শ্যাম্পু সবই রসায়নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এ সকল রাসায়নিক পদার্থ কীভাবে প্রস্তুত করা হয়, এগুলোর ধর্ম, ব্যবহার ইত্যাদি এই অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয়।

গৃহস্থালির রসায়ন
প্রাত্যহিক জীবনে আমরা আমাদের বাসায় নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করি। যেমন: খাদ্য লবণ, বেকিং পাউডার, ভিনেগার, কোমল পানীয় ইত্যাদি রাসায়নিক পদার্থ।
➲ খাদ্য লবণ:
মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর সুস্বাস্থ্যের জন্য লবণ অপরিহার্য। লবণের স্বাদ পাঁচটি মৌলিক স্বাদের মধ্যে একটি। লবণ অনেক রান্নায় ব্যবহার করা হয়। লবণ বহুল উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে একটি। সাগরের পানিতে অনেক বেশি পরিমাণে খাদ্য লবণ বা সোডিয়াম ক্লোরাইড (\(NaCl\)) থাকে এবং তার সাথে খুবই সামান্য পরিমাণে \(CaCl_2\), \(MgCl_2\) সহ অন্য কিছু লবণও দ্রবীভূত থাকে। আবার, মাটির তলদেশে খনিজ পদার্থ হিসেবেও সোডিয়াম ক্লোরাইড পাওয়া যায়। আমাদের দেশে সমুদ্রের পানি থেকে খাদ্য লবণ সংগ্রহ করা হয়। সমুদ্র উপকূলের লবণ চাষিরা বিভিন্ন আকৃতির বর্গাকার বা আয়তাকার জমির চারপাশে বাঁধ নির্মাণ করে খানিকটা খুলে রাখে।

চিত্র: অপরিশোধিত লবণ
জোয়ারের সময় যখন পানি লবণ চাষের জায়গায় প্রবেশ করে তখন পানি প্রবেশের মুখ বন্ধ করে জোয়ারের পানি আটকে দেওয়া হয়। যখন পানি সূর্যের তাপে শুকিয়ে যায় তখন ঐ জায়গায় লবণ দেখতে পাওয়া যায়। এটাকে সল্ট হারভেস্টিং বলে।

সল্ট হারভেস্টিং এর মাধ্যমে পাওয়া এই লবণকে শিল্পকারখানায় বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পাদন করে খাবার উপযোগী খাদ্য লবণে পরিণত করা হয়।

➢ অপরিশোধিত লবণ পরিশোধন: সল্ট হারভেস্টিং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত লবণের সাথে বালু ও অন্যান্য অপদ্রব্য মিশ্রিত থাকে। অপদ্রব্য মিশ্রিত লবণকে পরিশোধনের জন্য কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়।

০১
প্রথমে ভেজালযুক্ত লবণকে একটি পাত্রে পানিতে মিশ্রিত করে দ্রবীভূত করা হয় ফলে বালুসহ অন্যান্য অপদ্রব্য পাত্রের তলায় পড়ে থাকে।
০২
ভেজাল মিশ্রিত পানির দ্রবণ থেকে ফানেলের সাহায্যে ছেঁকে অপদ্রব্য ও লবণ মিশ্রিত পানির দ্রবণ পৃথক করা হয়।
০৩
পরবর্তীতে লবণ মিশ্রিত পানির দ্রবণটি একটি পাত্রে নিয়ে তাপ প্রদান করলে পানি বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যায় এবং লবণ পাত্রের তলায় পড়ে থাকে।
০৪
এভাবে আমরা লবণ পেয়ে থাকি। প্রাপ্ত লবণকে বাজারজাত করার লক্ষ্যে প্রস্তুত করে বিক্রির জন্য বাজারে পাঠানো হয়।


চিত্র: অপরিশোধিত লবণ পরিশোধন
💡 চিন্তা করে উত্তর দাও
💡 বর্ষাকালে খোলা পাত্রে লবণ রাখলে ভিজে যায় কেন?

বর্ষাকালে খাদ্যলবণ খোলা পাত্রে রাখলে ভিজে যায় কারণ এসময় বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যায় ফলে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়। ১০০% বিশুদ্ধ সোডিয়াম ক্লোরাইড \(\text{(NaCl)}\) পানিগ্রাহী পদার্থ নয়। কিন্তু খাবার লবণে সোডিয়াম ক্লোরাইডের সাথে কিছু পরিমাণ অপদ্রব্য হিসেবে ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড \(\text{(CaCl}_2\text{)}\) ও ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড \(\text{(MgCl}_2\text{)}\) ইত্যাদি পানিগ্রাহী পদার্থ মিশ্রিত থাকে। এসব অপদ্রব্য বায়ুমণ্ডল থেকে পানি শোষণ করতে পারে। এর ফলে বর্ষাকালে বায়ুতে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় এসব অপদ্রব্য পানি শোষণ করে। ফলে লবণ ভিজে পানিতে দ্রবীভূত হয়ে যায়।

খাদ্য লবণের ব্যবহার
০১

ভাতের সাথে আমরা তরকারি খাই। তরকারিতে NaCl লবণ না দিলে তরকারি সুস্বাদু হয় না।

০৩

ডায়রিয়া বা পানিশূন্যতা পূরণের জন্য ওষুধ শিল্পে স্যালাইনের মধ্যে NaCl প্রয়োজন হয়।

শিল্পকারখানায় NaOH যৌগ প্রস্তুত করার জন্য NaCl ব্যবহৃত হয়।

০২

সোডিয়াম ক্লোরাইড জীবাণুনাশক ও পচন নিবারক, সেজন্য মাছ-মাংস সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।

০৪
🙋‍♂️ চিন্তা করে উত্তর দাও
💡 নদীর পানি লবণাক্ত না হলেও সাগরের পানি লবণাক্ত হয় কেন?

সমুদ্রের পানিতে লবণের অন্যতম জোগানদাতা ভূপৃষ্ঠ বা ভূপৃষ্ঠে থাকা নানা ধরনের শিলা ও পাথর। বৃষ্টির পানির ফোঁটা মাটিতে পড়ার সময় তাতে বাতাসের কার্বন ডাইঅক্সাইড দ্রবীভূত হয় ফলে সামান্য এসিডিক ধর্ম তৈরি হয় বৃষ্টির পানির। বৃষ্টির পানি কার্বন ডাইঅক্সাইডের সাথে মিশে কার্বনিক এসিড তৈরি করে।

$$ CO_2 + H_2O \longrightarrow H_2CO_3 $$

মৃদু এসিডিক ধর্মবিশিষ্ট বৃষ্টির পানি ভূপৃষ্ঠের শিলা ও পাথরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় শিলা কিছুটা ক্ষয়ে যায়। বিভিন্ন ধরনের আয়ন তৈরি হয়। সহজ ভাষায় পানিতে লবণ দ্রবীভূত হয়। দ্রবীভূত লবণ নদী হয়ে সমুদ্রে পৌঁছায়। সূর্যের উত্তাপে সমুদ্র থেকে পানি বাষ্পীভূত হয় কিন্তু নদীর পানির সাথে আসা লবণ থেকে যায়। এভাবেই সমুদ্রের পানি লবণাক্ত হয়ে উঠে। নদীর পানি প্রবাহিত হয়ে সাগরে পতিত হয়। সাগরের বিশাল জলরাশির মধ্যে লবণ ও পানি আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে নদীর পানি লবণাক্ত না হলেও সাগরের পানি লবণাক্ত হয়।

খাদ্য লবণের বৈশিষ্ট্য
০১

সোডিয়াম ক্লোরাইডের গলনাঙ্ক 801 °C এবং এর স্ফুটনাঙ্ক 1465 °C।

০৪

খাদ্য লবণ গন্ধহীন ও অনুদ্বায়ী পদার্থ।

০২

সোডিয়াম ক্লোরাইড একটি অজৈব লবণ।

০৫

পানিতে দ্রবীভূত হয় এবং এরা জলীয় দ্রবণে নিরপেক্ষ পদার্থ।

০৩

সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিন, সাদা এবং কেলাসিত পদার্থ।

০৬

সোডিয়াম ক্লোরাইড আয়নিক যৌগ ফলে গলিত ও জলীয় অবস্থায় তড়িৎ পরিবহণ করে।

১ বেকিং পাউডার:
আমরা কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করে থাকি। কেকটি তৈরিতে বেকিং পাউডার ব্যবহার করা হয়। বেকিং পাউডার একটি রাসায়নিক পদার্থ যা খাবারকে ফোলাতে এবং নরম করতে ব্যবহৃত হয়।

বেকিং পাউডার হলো সোডিয়াম হাইড্রোজেন কার্বনেটের (\(NaHCO_3\)) সাথে টারটারিক এসিডের (\(C_4H_6O_6\)) মিশ্রণ। বেকিং সোডাকে বিক্রিয়া পাত্র থেকে পৃথক করে তার সাথে টারটারিক এসিড মেশানো হয়। এ মিশ্রণকে বেকিং পাউডার বলে।

➤ বেকিং সোডা প্রস্তুতি: বেকিং সোডা (\(NaHCO_3\)) প্রস্তুতির জন্য বিক্রিয়ক হিসেবে অ্যামোনিয়া গ্যাস, খাদ্য লবণ, পানি এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড প্রয়োজন। অ্যামোনিয়া ও কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস একসাথে পানির উপর চালনা করা হয়। এক্ষেত্রে \(CO_2\), \(NH_3\), \(H_2O\) একত্রিত হয়ে প্রথমে অ্যামোনিয়াম হাইড্রোজেন কার্বনেট (\(NH_4HCO_3\)) উৎপন্ন করে। এরপর অ্যামোনিয়াম হাইড্রোজেন কার্বনেট বা অ্যামোনিয়াম বাই কার্বনেট সোডিয়াম ক্লোরাইড সম্পৃক্ত দ্রবণের সাথে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম হাইড্রোজেন কার্বনেট (\(NaHCO_3\)) বা বেকিং সোডা উৎপন্ন করে।

$$ \displaylines{ CO_2 + NH_3 + H_2O \longrightarrow NH_4HCO_3 \\ NH_4HCO_3 + NaCl \longrightarrow NaHCO_3 + NH_4Cl } $$

➤ বেকিং সোডার ব্যবহার: বেকিং সোডার সাহায্যে বেকিং পাউডার তৈরি করা হয়। বেকারি কিংবা বাসা-বাড়িতে কেক প্রস্তুতির সময় ময়দার সাথে বেকিং পাউডার মিশিয়ে দেওয়া হয়। যা তাপ প্রদান করার ফলে কার্বন ডাইঅক্সাইড (\(CO_2\)) গ্যাস উৎপন্ন করে। এই \(CO_2\) গ্যাস কেক বা ব্রেডকে ফুলিয়ে উড়ে যায়।

$$ 2NaHCO_3 + C_4H_6O_6 \longrightarrow C_4H_4Na_2O_6 + 2CO_2 \uparrow + 2H_2O $$

বাড়িতে কিংবা বেকারিতে পাউরুটি ফোলানোর জন্য ইস্ট নামক ছত্রাকও ব্যবহার করা হয়। এ জন্য প্রথমে চিনির দ্রবণে ইস্ট মেশানো হয়। এই মিশ্রণ দিয়ে ময়দা মাখিয়ে দলা করে উষ্ণ জায়গায় রেখে দিলে ইস্টের সবাত শ্বসনের কারণে কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয় যা পাউরুটিকে ফুলতে সাহায্য করে। পাউরুটি ফুলে ওঠার পর ওভেনে বেকিং করা হলে উত্তাপে ইস্ট মারা যায়, তখন পাউরুটির ফোলা বন্ধ হয়।

চলো এখন আমরা বেকিং সোডা এবং বেকিং পাউডারের পার্থক্য জেনে নেই-

পার্থক্যের ধরণ বেকিং সোডা বেকিং পাউডার
সংজ্ঞা সোডিয়াম হাইড্রোজেন কার্বনেটকে খাবার সোডা বা বেকিং সোডা বলা হয়। বেকিং সোডা ও টারটারিক এসিডের মিশ্রণকে বেকিং পাউডার বলা হয়।
সংকেত \( NaHCO_3 \) \( NaHCO_3 + C_4H_6O_6 \)
ব্যবহার এসিডিক উপকরণে এবং ঝটপট ফুলে ওঠা প্রয়োজন যেসব খাবারে। সাধারণত কেক, পাউরুটি বানানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।
পরিমাণ পরিমাণে অল্প লাগে এবং কম সময়ে রান্না হয়। পরিমাণে বেশি লাগে এবং বেশি সময়ে রান্না হয়।
🤔 চিন্তা করে উত্তর দাও
💡 বেকিং সোডা ও ইস্টের মধ্যে কোনটি অধিক ব্যবহার উপযোগী?

তোমরা বাড়িতে কেক বা পাউরুটি ফোলানোর জন্য ইস্ট ও বেকিং পাউডার ব্যবহার করে থাকলে দেখবে ইস্ট দিয়ে প্রস্তুতকৃত কেক বা পাউরুটি বেশি ফুলেছে। কারণ, ইস্ট এক প্রকার ছত্রাক যা কার্বোহাইড্রেট ও অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করে। উৎপন্ন \( CO_2 \) গ্যাস কেক বা পাউরুটি ফোলাতে সাহায্য করে। পাউরুটি প্রয়োজনীয় পরিমাণ ফোলার পর ওভেনে বেকিং করা হয়। উত্তাপে ইস্ট মরে যায় এবং \( CO_2 \) উৎপন্ন হওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কেক বা পাউরুটি ফোলাও বন্ধ হয়ে যায়। যেহেতু উত্তাপে ইস্ট মরে যায় সেহেতু এটির মানবদেহে কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তাই বেকিং সোডা অপেক্ষা ইস্ট বেশি ব্যবহার উপযোগী।

চিত্র: ইস্টের সাহায্যে প্রস্তুতকৃত কেক বা পাউরুটি

💡 বেকিং পাউডার বদহজমে কীভাবে সহায়তা করে?

বেকিং পাউডার একটি অম্লনাশক পদার্থ বিধায় গ্যাস্ট্রিক বা পেটের এসিড জাতীয় কারণে জ্বালা পোড়া করা বা বদ হজমে বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা রাখে। বেকিং পাউডার পেটের এসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে তাৎক্ষণিক রেহাই পেতে সাহায্য করে।

আমাদের পেটের পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক (HCl) এসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে বদহজম সমস্যার সৃষ্টি হয়। বেকিং পাউডারে \(\text{NaHCO}_3\) থাকে, যা অম্লনাশক পদার্থ। বদহজম থেকে উপশম পাওয়ার জন্য আমরা বিভিন্ন এন্টাসিড জাতীয় ঔষধ খেয়ে থাকি। তবে বদহজমে বেকিং সোডা ব্যবহার করা যায়। বেকিং পাউডার (\(\text{NaHCO}_3\)) ক্ষার জাতীয় হওয়ায় তা অম্লজাতীয় HCl কে প্রশমিত করে বদহজম সমস্যার সমাধান ঘটায়। এজন্য বদহজম থেকে উপশমের জন্য বেকিং সোডা ব্যবহার করা যায়।

$$ \text{NaHCO}_3 + \text{HCl} \longrightarrow \text{NaCl} + \text{CO}_2 + \text{H}_2\text{O} $$
➲ ভিনেগার:

আমরা বাসাবাড়িতে বিভিন্ন সময় আচার, চাটনি, মোরব্বা, সস্ ইত্যাদি সংরক্ষণে এক ধরনের স্বচ্ছ তরলজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করে থাকতে দেখি। এ স্বচ্ছ তরল পদার্থটি হলো ভিনেগার।

📝 ইথানয়িক এসিডের 4 – 10% জলীয় দ্রবণকে ভিনেগার বলে। যা খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
ভিনেগার ও আপেল সিডার
📋 জেনে রাখো
ওজন কমাতে ইদানীং অনেকে আপেল সিডার ভিনেগার-এর উপরেই ভরসা রাখেন। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের মধ্যে জনপ্রিয় এই টনিক। রক্তে কোলেস্টেরল ও শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এর জুড়ি মেলা ভার। সৌন্দর্য রক্ষায়ও কাজে লাগে এটি। ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দূর করার অন্যতম উপায় হচ্ছে আপেল সিডার ভিনেগার। নিয়মিত এটি খেলে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা কমে যায়। সেই সঙ্গে ওজনও কমে। এছাড়া প্রদাহ কমিয়ে আপেল সিডার ভিনেগার লিভারের কার্যকারিতা ঠিক রাখে।
➤
ভিনেগার প্রস্তুতি: আখ, আপেল, খেজুর ইত্যাদির রসকে এনজাইম ও ইস্টের সাহায্যে গাঁজন (ফারমেন্টেশন) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইথানল পাওয়া যায়। প্রাপ্ত ইথানলকে সাধারণ তাপমাত্রায় অ্যাসিটোব্যাক্টর কর্তৃক নিঃসৃত এনজাইমের উপস্থিতিতে অক্সিজেন গ্যাসের বুদবুদ প্রবাহিত করলে ইথানল জারিত হয়ে অ্যাসিটিক এসিড বা ইথানয়িক এসিড তৈরি করে। যা ভিনেগার বা সিরকা নামে পরিচিত।
$$ \text{CH}_3\text{CH}_2\text{OH} + \text{O}_2 \xrightarrow{\text{অ্যাসিটোব্যাক্টর}} \text{CH}_3\text{COOH} + \text{H}_2\text{O} $$
এছাড়াও ভিনেগারের সাহায্যে ফল, শাকসবজি, মাছ-মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও খাদ্য সংরক্ষণ করা হয়। এটি খাদ্যদ্রব্যের গুণ ও মানে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না।
➤
খাদ্য সংরক্ষণে ভিনেগারের কৌশল: আমাদের খাদ্য শিকলের প্রধান খাদ্য উপাদানগুলো দীর্ঘ শিকলের পলিমার যৌগ। কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য ভাত, গম, আলু ইত্যাদি গ্লুকোজের পলিমার। আবার, প্রোটিন জাতীয় খাদ্য মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি হলো অ্যামিনো এসিডের পলিমার। পরিবেশে বিদ্যমান বিভিন্ন অণুজীব (ব্যাকটেরিয়া) এর আক্রমণের ফলে খাদ্য উপাদানের পলিমারীয় কাঠামো ভেঙে যায়। ফলে খাদ্যের স্বাদ বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং পচে যায়। এসব খাদ্যের মধ্যে ভিনেগার যোগ করার ফলে ইথানয়িক এসিড দ্রবণের আংশিক বিয়োজনের ফলে উৎপন্ন প্রোটন (H⁺) খাদ্য উপাদানের পলিমারীয় কাঠামোকে ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করে এবং অণুজীব ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে দেয়।
$$ \text{CH}_3\text{COOH} \rightleftharpoons \text{CH}_3\text{COO}^- + \text{H}^+ $$
ফলে খাদ্যদ্রব্যগুলো পচনের হাত থেকে রক্ষা পায়। এভাবেই ভিনেগার খাদ্য সংরক্ষণ করে।
➤
কোমল পানীয়: ঠাণ্ডা কোমল পানীয় পান করার সময় বোতলের মুখ খুললে বুদবুদ আকারে যে গ্যাস বের হয় তা CO₂ গ্যাস। কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস উচ্চ চাপে পানি ও চিনির দ্রবণের মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে থাকে এবং পানির সাথে বিক্রিয়া করে কার্বনিক এসিড উৎপন্ন করে।
$$ \text{CO}_2 + \text{H}_2\text{O} \xrightarrow{\text{উচ্চ চাপ}} \text{H}_2\text{CO}_3 $$
এই কার্বনিক এসিড বিপাকীয় ক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে পরিপাকে সহায়তা করে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় রসায়ন

সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। ঘর, কাপড়, শরীর সবকিছু পরিষ্কার রাখার মধ্যে মানসিক প্রশান্তিও রয়েছে। সুস্থ দেহের সুস্থ মনকেই স্বাস্থ্য বলা হয়। আমাদের শরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আমরা প্রসাধনী সাবান ব্যবহার করি। আমাদের পোশাক বা কাপড়-চোপড় পরিষ্কার রাখার জন্য আমরা কাপড় কাচার সোডা, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি ব্যবহার করি। ঘরের জানালার কাচ বা অন্যান্য কাচদ্রব্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য আমরা গ্লাস ক্লিনার ব্যবহার করি। টয়লেট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য টয়লেট ক্লিনার ব্যবহার করি। এসব পরিষ্কার সামগ্রীর প্রস্তুতি এবং পরিষ্কারকরণের ক্রিয়াকৌশল নিম্নে আলোচনা করা হলো।

➲ কাপড় কাচার সোডা:

আগেকার দিনে তো সাবান বা ডিটারজেন্টের তেমন প্রচলন ছিল না! তা-সত্ত্বেও রাজা-রানীদের পোশাক-আশাক কেমন করে ঝলমলে থাকত! এটি কি কখনো ভেবে দেখেছো?
প্রাচীনকাল থেকেই কাপড় কাচার সোডা ব্যবহার হয়ে আসছে। কাপড় কাচার সোডার রাসায়নিক নাম সোডিয়াম কার্বনেট ডেকাহাইড্রেট (\(\text{Na}_2\text{CO}_3.10\text{H}_2\text{O}\))।

📝
সোডা অ্যাশ যা কিনা সোডিয়াম কার্বনেট (\(\text{Na}_2\text{CO}_3\)) এর ১টি অণুর সাথে 10 অণু পানি (\(\text{H}_2\text{O}\)) যুক্ত হয়ে সোদক কেলাস গঠন (\(\text{Na}_2\text{CO}_3.10\text{H}_2\text{O}\)) করলে তাকে কাপড় কাচা বা ওয়াশিং সোডা বলে।
➤ কাপড় কাচা সোডা প্রস্তুতি:

গাঢ় \(\text{NaOH}\) দ্রবণের মধ্যে \(\text{CO}_2\) কে অধিক পরিমাণে চালনা করলে সোডিয়াম কার্বনেট উৎপন্ন হয় যা পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে।

$$2\text{NaOH} + \text{CO}_2 \longrightarrow \text{Na}_2\text{CO}_3 + \text{H}_2\text{O}$$

বিক্রিয়া পাত্রের মধ্যে \(\text{Na}_2\text{CO}_3\) এবং পানি থাকে। সোডিয়াম কার্বনেট 10 অণু পানির সাথে যুক্ত হয়ে কাপড় কাচা সোডা (\(\text{Na}_2\text{CO}_3.10\text{H}_2\text{O}\)) উৎপন্ন হয়।

$$\text{Na}_2\text{CO}_3 + 10\text{H}_2\text{O} \longrightarrow \text{Na}_2\text{CO}_3.10\text{H}_2\text{O}$$
কাপড় কাচার সোডার ব্যবহার
  • জামা-কাপড় পরিষ্কার করতে।
  • কস্টিক সোডা কাচ, সাবান প্রভৃতি প্রস্তুতিতে প্রধান উপাদান হিসাবে।
  • পরীক্ষাগারে বিকারক হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
  • বস্ত্র ও কাগজ শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
  • পানির স্থায়ী ও অস্থায়ী খরতা দূর করতে।

➲ টয়লেট ক্লিনার:
বাসা-বাড়িতে টয়লেট ক্লিনার হিসাবে হারপিক ও বিভিন্ন পাউডার জাতীয় পদার্থ বহুল ব্যবহৃত হয়। এ সকল পদার্থের প্রধান উপাদান সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH)। টয়লেট ক্লিনারে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডের সাথে সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট (NaOCl) মিশ্রিত থাকে। যখন টয়লেট, বেসিন, কমোড ইত্যাদিতে টয়লেট ক্লিনার যোগ করা হয়, তখন সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড চর্বি জাতীয় পদার্থ, প্রোটিন জাতীয় পদার্থ ইত্যাদির সাথে বিক্রিয়া করে এবং সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট বিভিন্ন রংয়ের পদার্থ এবং রোগজীবাণুর সাথে বিক্রিয়া করে এদের কার্যকারিতা নষ্ট করে।

➢ টয়লেট ক্লিনার দ্বারা পরিষ্কারের কৌশল: টয়লেট ক্লিনারকে যখন টয়লেটের উপর ঢালা হয় তখন টয়লেট ক্লিনারের বিভিন্ন উপাদান বিভিন্নরূপে বিক্রিয়া করে। টয়লেট ক্লিনারের মূল উপাদান NaOH এর ক্ষারধর্মী ধর্মের জন্য টয়লেট পরিষ্কার হয়। টয়লেট ক্লিনারের সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট (NaOCl) পানির সাথে বিক্রিয়া করে হাইপোক্লোরাস এসিডে (HOCl) পরিণত হয় যা ভেঙে জায়মান অক্সিজেন উৎপন্ন করে। এই জায়মান অক্সিজেন রঙিন পদার্থকে বর্ণহীন করে এবং জীবাণুকে ধ্বংস করে।

$$ \text{NaOCl} + \text{H}_2\text{O} \longrightarrow \text{NaOH} + \text{HOCl} $$ $$ \text{HOCl} \longrightarrow \text{HCl} + [\text{O}] $$
রঙিন পদার্থ + [O] \(\longrightarrow\) বর্ণহীন পদার্থ

জীবাণু + [O] \(\longrightarrow\) মৃত জীবাণু

এভাবে টয়লেট ক্লিনার রঙিন পদার্থকে বর্ণহীন করে এবং জীবাণুকে ধ্বংস করে। (তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে জায়মান অক্সিজেনকে বোঝানো হয়। জায়মান অক্সিজেন = [O])

💡 চিন্তা করে উত্তর দাও
💡 টয়লেট ক্লিনারে সবল ক্ষার ব্যবহার করা হলেও গ্লাস ক্লিনারে মৃদু ক্ষার ব্যবহার করা হয় কেন?

টয়লেট ক্লিনারে সবল ক্ষার \(\mathrm{NaOH}\) এর দ্রবণ ব্যবহার করা হয়। টয়লেটের কমোডে প্রস্রাব বা মলের দাগ লেগে থাকে। এই দাগে ইউরিয়া, ইউরিক এসিড, তেল, চর্বি ইত্যাদি থাকে। টয়লেট ক্লিনার হিসেবে কস্টিক সোডা (\(\mathrm{NaOH}\)) ব্যবহার করলে এদের সাথে বিক্রিয়া করে গ্লিসারিন ও দ্রবণীয় সাবান উৎপন্ন করে। ফলে এসব দাগ সহজেই প্রশমিত হয়ে দূর হয়। এছাড়াও সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডের সাথে সামান্য সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট (\(\mathrm{NaOCl}\)) থাকায় তা টয়লেটের কমোডের যে কোন বর্ণের দাগ দূর করে। অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড দ্রবণ দুর্বল ক্ষারক হওয়ায় এ কাজটি করতে পারে না। এ জন্য টয়লেট ক্লিনার তৈরিতে \(\mathrm{NaOH}\) ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে, গ্লাসে অনেক ধুলাবালি জমে যা হচ্ছে অম্লীয়। তাই তা পরিষ্কার করতে ক্ষারের দরকার। কিন্তু গ্লাস এর মূল উপাদান \(\mathrm{SiO_2}\) ও অম্লীয়। তাই সব ক্ষার পরিষ্কারক হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। তখন গ্লাসের মূল উপাদান এর সাথে সবল ক্ষার বিক্রিয়া করে ফেলে ও গ্লাসকে নষ্ট করে দেয়। তাই \(\mathrm{NaOH}\) এগুলো ব্যবহার করা যায় না। আর এদিকে অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড মৃদু ক্ষার হওয়ায় তা ধুলাবালিকে পরিষ্কার করলেও গ্লাসের কোনো ক্ষতি করে না। তাই, গ্লাস ক্লিনারে মৃদু ক্ষার (\(\mathrm{NH_4OH}\)) ব্যবহৃত হয়।

🔴 সাবান:
সাবান

প্রাত্যহিক জীবনে বিভিন্ন কাজে আমাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় চলাফেরা করতে হয়। বাতাসের সাথে উড়ে আসা ধুলাবালি আমাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ মুখ, হাত, পা, ত্বক, নখ, চুল বা দেহের অন্যান্য অংশে জমা হয়। আবার শরীরের ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে আসে শরীরের ভিতরের তেল, চর্বি, লবণ, অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ। এসব কারণে আমাদের শরীর প্রতিনিয়ত ময়লা হয়। এছাড়াও আমাদের পরিধেয় কাপড় ও প্রধানত একই কারণে ময়লা হয়। এসব ময়লা দূরীকরণের জন্য পরিষ্কারক হিসাবে সাধারণত আমরা সাবান ও ডিটারজেন্ট বহুল ব্যবহার করে থাকি। সাধারণত সাবান হলো উচ্চতর ফ্যাটি এসিড। অর্থাৎ, উচ্চ আণবিক ভর বিশিষ্ট (যেমন: স্টিয়ারিক এসিড, অলিক এসিড, পামিটিক এসিড) এর সোডিয়াম লবণ (\(\mathrm{R - COONa}\)) বা পটাশিয়াম লবণ (\(\mathrm{R - COOK}\))। এখানে \(\mathrm{R}\) হলো অ্যালকাইল গ্রুপ যার কার্বন সংখ্যা ১২-১৮ হয়ে থাকে।

রাসায়নিক নাম সংকেত
সোডিয়াম স্টিয়ারেট সাবান \(\mathrm{C_{17}H_{35} COONa}\)
পটাশিয়াম স্টিয়ারেট সাবান \(\mathrm{C_{17}H_{35} COOK}\)
সোডিয়াম পামিটেট সাবান \(\mathrm{C_{15}H_{31} COONa}\)
সোডিয়াম অলিয়েট সাবান \(\mathrm{C_{17}H_{33} COONa}\)

আমাদের দেশে বাজারে বহুল প্রচলিত সাবান হলো সোডিয়াম পামিটেড সাবান।
ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে সাবানকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:

প্রসাধনী
সাবান
আমাদের দেহের ত্বককে পরিষ্কার করার জন্য যেসব সাবান ব্যবহার করি তাদেরকে প্রসাধনী সাবান বলে। প্রসাধনী সাবানগুলো সুগন্ধিযুক্ত হয়ে থাকে।
লন্ড্রি
সাবান
কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করার জন্য আমরা যেসব সাবান ব্যবহার করি তাদেরকে কাপড় কাচা সাবান বা লন্ড্রি সাবান বলা হয়।

➢ সাবান প্রস্তুতি: সাবানায়ন প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত সাবান এবং গ্লিসারিনের মিশ্রণের মধ্যে NaCl যোগ করলে গ্লিসারিন পাত্রের নিচে অবস্থান করে এবং সাবানের অণুগুলো NaCl কে ঘিরে একত্র হয়ে পাত্রের উপরের দিকে কেকের আকারে ভেসে উঠে। একে সোপ কেক বলে। সোপ কেককে ছাঁকনির সাহায্যে ছেঁকে পৃথক করে বিভিন্ন আকৃতির ছাঁচে ঢেলে বিভিন্ন আকৃতির সাবান তৈরি করা হয়। সাবান একটি পরিষ্কারক দ্রব্য যা তেল বা চর্বি ও ক্ষার থেকে প্রস্তুত করা হয়।

তেল বা চর্বি (উচ্চতর ফ্যাটি এসিড) এর সাথে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড বা পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড বিক্রিয়া করে সাবান ও গ্লিসারিন তৈরি হয়। এ প্রক্রিয়াকে সাবানায়ন বলে।
$$ \underset{\text{}}{\begin{array}{l} \text{CH}_2 - \text{COO C}_{17}\text{H}_{35} \\ \vert \\ \text{CH} - \text{COO C}_{17}\text{H}_{35} \\ \vert \\ \text{CH}_2 - \text{COO C}_{17}\text{H}_{35} \end{array}} \quad + \quad \underset{\text{}}{3\text{NaOH}} \quad \longrightarrow \quad \underset{\begin{array}{c} \text{} \\ \text{} \end{array}}{3\text{C}_{17}\text{H}_{35}\text{COONa}} \quad + \quad \underset{\text{}}{\begin{array}{l} \text{CH}_2 - \text{OH} \\ \vert \\ \text{CH} - \text{OH} \\ \vert \\ \text{CH}_2 - \text{OH} \end{array}} $$

সাবান প্রস্তুতির সময় উপজাত হিসাবে গ্লিসারল তৈরি হয়। এর বাণিজ্যিক নাম গ্লিসারিন। শীতকালে ঠোঁট ফাটা থেকে শুরু করে হাত-পা ফাটা আর শুষ্কতা দেখা দেয়। ত্বক শুষ্ক হোক কিংবা তৈলাক্ত সব ধরনের ত্বকের জন্যই গ্লিসারিন।

  • ঠোঁটের ফাটা রোধ করার জন্য প্রাচীনকাল থেকেই গ্লিসারিন ব্যবহার হয়ে আসছে।
  • শীতকালে একটি সাধারণ সমস্যা হচ্ছে গোড়ালি ফেটে যাওয়া। চামড়া ওঠা কিংবা গোড়ালি ফাটার মতো সমস্যার সমাধান দেয় গ্লিসারিন।
  • এছাড়াও গ্লিসারিন রুক্ষ ও শুষ্ক ত্বক কোমল এবং নরম করে।

আমরা বাড়িতে থাকা নারকেল তেল, লবণ (NaCl), কস্টিক সোডা (NaOH) দ্রবণ ব্যবহার করে সহজেই সাবান প্রস্তুত করতে পারি। প্রথমে একটি পাত্রে কিছু পরিমাণ নারকেল তেল ও এর মধ্যে কস্টিক সোডা দ্রবণ যোগ করে স্টিম বাথে ৩০ মিনিট ফুটানোর পর তা ঠাণ্ডা করে এর মধ্যে লবণ মিশ্রিত পানির সম্পৃক্ত দ্রবণ যোগ করে ২৪ ঘন্টা পর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে সাবান গ্লিসারিন মিশ্রণ তৈরি হয়েছে। মিশ্রণটিকে ছেঁকে শুকানোর পর এটিকে ছাঁচে নিয়ে বিভিন্ন আকৃতি দেওয়া হয়।

চিত্র: সাবান প্রস্তুতি

➲ ডিটারজেন্ট:
সাবানের মতোই আরেকটি পরিষ্কারক দ্রব্য হলো ডিটারজেন্ট। ডিটারজেন্ট বাজারে পাউডার ও তরল আকারে পাওয়া যায়। ডিটারজেন্ট ও সাবানের ময়লা পরিষ্কার করার কৌশল একই রকম হলেও ডিটারজেন্ট অণুর গঠন সাবানের অণুর থেকে ভিন্ন ধরনের। ডিটারজেন্ট হচ্ছে দীর্ঘ কার্বন শিকলবিশিষ্ট সালফোনিক এসিডের সোডিয়াম লবণ। বহুল ব্যবহৃত ডিটারজেন্ট হচ্ছে সোডিয়াম লরাইল সালফেট (\(\mathrm{C_{12}H_{25}SO_4Na}\))।

➢
ডিটারজেন্ট প্রস্তুতি: প্রথমে লরাইল অ্যালকোহলের সাথে সালফিউরিক এসিডের বিক্রিয়ায় লরাইল হাইড্রোজেন সালফেট উৎপন্ন করা হয়।
\(\mathrm{C_{12}H_{26}O + H_2SO_4 \longrightarrow C_{12}H_{26}SO_4 + H_2O}\)

প্রাপ্ত লরাইল হাইড্রোজেন সালফেটের সাথে কস্টিক সোডা (\(\mathrm{NaOH}\)) যোগ করে সোডিয়াম লরাইল সালফেট উৎপন্ন করা হয়। উৎপন্ন পদার্থটিই হলো ডিটারজেন্ট।

\(\mathrm{C_{12}H_{26}SO_4 + NaOH \longrightarrow C_{12}H_{25}SO_4Na + H_2O}\)

ডিটারজেন্টকে ব্যবহার উপযোগী করার জন্য ডিটারজেন্টের মধ্যে বিভিন্ন পদার্থ যোগ করা হয়। ডিটারজেন্টকে পাউডার আকৃতির করার জন্য সোডিয়াম সালফেট (\(\mathrm{Na_2SO_4}\)) যোগ করা হয়।

➢
সাবান ও ডিটারজেন্ট দ্বারা ময়লা পরিষ্কার করার কৌশল: সাবান ও ডিটারজেন্টের মূল কাজ হলো কাপড়-চোপড় থেকে তেলকে অপসারণ করা এবং পানি দিয়ে ধুয়ে ধুলাবালিকে অপসারণ করা। আমাদের শরীর থেকে তৈলাক্ত পদার্থ বের হয়ে কাপড়ে লেগে যায়। এছাড়া বাতাস থেকে কিছু তৈলাক্ত পদার্থ কাপড়ে লেগে যায়। এরপর ধুলাবালি এই তৈলাক্ত পদার্থের উপর লেগে ময়লা তৈরি করে।

সাবান (\(\mathrm{R-COONa}\)) ও ডিটারজেন্ট (\(\mathrm{C_{12}H_{25}SO_4Na}\)) একটি দীর্ঘ কার্বন শিকলবিশিষ্ট অণু। পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় এরা ঋণাত্মক চার্জ বিশিষ্ট সাবান (\(\mathrm{R-COO^-}\)) বা ডিটারজেন্ট আয়ন (\(\mathrm{C_{12}H_{25}SO_4^-}\)) এবং ধনাত্মক সোডিয়াম আয়নে (\(\mathrm{Na^+}\)) ভাগ হয়ে যায়। সাবান বা ডিটারজেন্ট আয়নের এক প্রান্তে ঋণাত্মক চার্জ যুক্ত থাকে। এই প্রান্ত পানিকে আকর্ষণ করে বলে হাইড্রোফিলিক বা পানি আকর্ষী বলে। সাবান ডিটারজেন্ট আয়নের অন্য প্রান্ত তেল বা গ্রিজে দ্রবীভূত হয়, এই প্রান্তকে হাইড্রোফোবিক বা পানি বিকর্ষী বলে।


চিত্র: সাবান কিংবা ডিটারজেন্ট দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করার কৌশল।

সাবান কিংবা ডিটারজেন্টকে যখন পানির উপস্থিতিতে তেল বা গ্রিজ জাতীয় ময়লাযুক্ত কাপড়ের সংস্পর্শে আনা হয় তখন তার হাইড্রোফোবিক প্রান্ত তেল বা গ্রিজের দিকে আকর্ষিত হয় এবং এতে দ্রবীভূত হয়। অন্যদিকে হাইড্রোফিলিক অংশ পানির দিকে আকর্ষিত হয় এবং পানির স্তরে প্রসারিত হয়। এ অবস্থায় কাপড়কে ঘষা দিলে বা মোচড়ানো হলে তেল বা গ্রিজের ময়লার কণা চারদিক থেকে সাবান বা ডিটারজেন্টের ঋণাত্মক চার্জ বিশিষ্ট আয়ন দিয়ে আবৃত হয়ে পড়ে এবং তেল বা গ্রিজের ময়লার কণার চারপাশে ঋণাত্মক চার্জের একটা বলয় সৃষ্টি হয়। তখন এগুলো একটি আরেকটি থেকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ দূরত্বে থাকতে চায় এবং তেল, সাবান এবং পানির সাথে একত্র হয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করে। এই মিশ্রণ ফেনা নামে পরিচিত। ফেনাতে আরো পানি যোগ করলে ফেনা অপসারিত হবার সাথে তেল ও ধুলাবালি কাপড় থেকে অপসারিত হয়। এভাবেই সাবান ময়লা পরিষ্কার করে।

🤔 চিন্তা করে উত্তর দাও
💡 জামা-কাপড় পরিষ্কার করার জন্য কোনটি অধিক উপযোগী- সাবান নাকি ডিটারজেন্ট?

সাবান ও ডিটারজেন্ট উভয়ই পরিষ্কারক পদার্থ। সাবান হচ্ছে উচ্চতর ফ্যাটি এসিডের সোডিয়াম বা পটাশিয়াম লবণ ($R - COONa/K$)। আবার ডিটারজেন্ট হচ্ছে সোডিয়াম বা পটাশিয়াম এর সালফেট লবণ ($C_{12}H_{25}SO_4Na/K$)। সাবান সাধারণত খর পানিতে ভালো কাপড় পরিষ্কার করতে পারে না এবং ঠাণ্ডা পানিতে কম দ্রবীভূত হয়। কারণ খর পানিতে উপস্থিত $Ca^{2+}$, $Mg^{2+}$, $Fe^{2+}$ বিক্রিয়া করে সাবানের গাদ বা অধঃক্ষেপ তৈরি করে। যার কারণে সাবানের অপচয় হয় এবং কাপড়ের সুতার ক্ষতি হয়। অন্যদিকে, ডিটারজেন্ট খর পানির $Ca^{2+}$, $Mg^{2+}$, $Fe^{2+}$ দ্রবণীয় লবণ তৈরি করে। ডিটারজেন্ট খর ও মৃদু পানিতে সমানভাবে কার্যকর। তাই ময়লা কাপড় পরিষ্কারকরণে সাবান অপেক্ষা ডিটারজেন্ট অধিক উপযোগী।

চলো এখন আমরা সাবান ও ডিটারজেন্টের মধ্যে পার্থক্য জেনে নেই-

সাবান
ডিটারজেন্ট
সাবান হলো দীর্ঘ কার্বন শিকলবিশিষ্ট ফ্যাটি এসিডের সোডিয়াম বা পটাশিয়াম লবণ।
১
ডিটারজেন্ট হলো দীর্ঘ কার্বন শিকলবিশিষ্ট বেনজিন সালফোনিক এসিডের সোডিয়াম লবণ।
সাবান খর পানিতে ভালো কাজ করতে পারে না।
২
ডিটারজেন্ট খর পানিতে ভালো কাজ করতে পারে।
ডিটারজেন্টের চেয়ে পরিষ্কারকরণের ক্ষমতা সাবানের কম।
৩
সাবানের চেয়ে পরিষ্কারকরণের ক্ষমতা ডিটারজেন্টের বেশি।
📝 জেনে রাখো
লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশ হল একটি অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল তরল পদার্থ যা সাবান ও ডিটারজেন্ট দ্রবীভূত করে তৈরি করা হয়। যা হাতের সক্রিয় ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়। ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য তরল সাবানের ব্যবহারের সুবিধার কারণে সাধারণ মানের সাবানের চেয়ে লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশ অধিক উপযোগী।
০১ সাবান ও ডিটারজেন্টের মধ্যে কিছু পরিমাণ ক্ষার উপস্থিত থাকায় অতিরিক্ত ব্যবহার ত্বকের ক্ষতি করে।
০৫ পুকুর-নদীর পানিতে মিশে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
অতিরিক্ত সাবান ও ডিটারজেন্ট ব্যবহারের কুফল
০২ অক্সিজেনের অভাবে জলজ প্রাণী মারা যায়।
০৪ ডিটারজেন্ট বায়োডিগ্রেডেবল নয়, ফলে মাটি ও পানিতে সহজে বিয়োজিত হয় না।
০৩ দীর্ঘ শিকলগুলো পানিতে অবিকৃতভাবে থাকায় পানির দূষণ ঘটায়।

১. ব্লিচিং পাউডার:

কাপড়ে কোন দাগ লাগলে অনেক সময় সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে তা পরিষ্কার করা যায় না। এগুলো পরিষ্কার করার জন্য যে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় তা হলো ব্লিচিং পাউডার। সবচেয়ে পরিচিত ব্লিচিং পাউডার হলো ক্যালসিয়াম ক্লোরো হাইপোক্লোরাইট \( [Ca(OCl)Cl] \)। \( 40^\circ C \) তাপমাত্রায় \( Ca(OH)_2 \) এর ভিতর দিয়ে \( Cl_2 \) গ্যাস চালনা করলে ব্লিচিং পাউডার উৎপন্ন হয়।

\[ Ca(OH)_2 + Cl_2 \xrightarrow{\Delta} Ca(OCl)Cl + H_2O \]

➤ ব্লিচিং পাউডার দ্বারা কাপড়ের রঙিন দাগ উঠানোর কৌশল: ব্লিচিং পাউডার কাপড়ের রঙিন দাগকে বর্ণহীন করে। এজন্য ব্লিচিং পাউডারকে বিরঞ্জক বলা হয়। কাপড়ের দাগ ও ব্লিচিং পাউডার উভয়ই রাসায়নিক পদার্থ। ব্লিচিং পাউডারকে যখন কোনো কাপড়ের দাগের উপর রেখে পানি যোগ করা হয় তখন ব্লিচিং পাউডার প্রথমে পানির সাথে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড \( (CaCl_2) \) এবং হাইপোক্লোরাস এসিড \( (HOCl) \) তৈরি করে।

\[ Ca(OCl)Cl + H_2O \longrightarrow CaCl_2 + HOCl \]

\( HOCl \) ভেঙ্গে গিয়ে \( HCl \) ও জায়মান অক্সিজেন \( [O] \) তৈরি করে।

\[ HOCl \longrightarrow HCl + [O] \]

রঙিন পদার্থের সাথে জায়মান অক্সিজেন \( [O] \) বিক্রিয়া করে রঙিন পদার্থকে বর্ণহীন করে।

রঙিন পদার্থ + \( [O] \longrightarrow \) বর্ণহীন পদার্থ

➤ ব্লীচিং পাউডার দ্বারা জীবাণু ধ্বংস করার কৌশল: ঘরের মেঝে, কমোড, বেসিন ইত্যাদি জায়গা থেকে জীবাণু ধ্বংস করার কাজে ব্লীচিং পাউডার ব্যবহার করা হয়। ব্লীচিং পাউডারকে যখন কোনো ঘরের মেঝে, কমোড, বেসিন ইত্যাদির উপর রেখে পানি যোগ করা হয় তখন ব্লীচিং পাউডার প্রথমে পানির সাথে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড \((CaCl_2)\) এবং হাইপোক্লোরাস এসিডে \((HOCl)\) পরিণত হয়।

$$Ca(OCl)Cl + H_2O \longrightarrow CaCl_2 + HOCl$$

হাইপোক্লোরাস এসিড ভেঙে গিয়ে জায়মান অক্সিজেন \([O]\) তৈরি করে যা জীবাণুকে ধ্বংস করে।

$$HOCl \longrightarrow HCl + [O]$$ $$জীবাণু + [O] \longrightarrow মৃত জীবাণু$$

➤ ব্লীচিং পাউডারের ব্যবহার: বাড়ির আশেপাশে ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় বা টয়লেটের কমোড, ঘরের মেঝে ইত্যাদি জায়গা থেকে জীবাণু ধ্বংস করার জন্য ব্লীচিং পাউডার ব্যবহার করা যায়। এছাড়াও হাসপাতালের বিভিন্ন ক্ষতিকারক বর্জ্যের জীবাণু ধ্বংস করার জন্য ব্লীচিং পাউডার বহুল ব্যবহৃত হয়। ব্লীচিং পাউডারকে যখন ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় ছিটিয়ে দেওয়া হয় বা টয়লেটের কমোড, বেসিনে দেওয়ার পর পানি যোগ করা হয়, তখন ব্লীচিং পাউডার পানির সাথে বিক্রিয়া করে হাইপোক্লোরাস এসিড \((HOCl)\) এবং ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড উৎপন্ন করে। পরবর্তীতে হাইপোক্লোরাস এসিড ভেঙে গিয়ে জায়মান অক্সিজেন তৈরি করে যা জীবাণুকে ধ্বংস করে।

সতর্কতা: ব্লীচিং পাউডারের মধ্যেই বিভিন্ন ক্ষতিকারক উপাদান লুকিয়ে রয়েছে। যদি সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শে আসে ব্লীচিং পাউডার তাহলে তা ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। ব্লীচিং পাউডার ব্যবহার করলে শ্বাসকষ্টের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।


➲ গ্লাস ক্লিনার:
কাচের গায়ে যদি তেল, চর্বি বা গ্রিজ লাগে তবে এগুলোর উপর ধুলাবালি পড়ে কাচে ময়লা তৈরি হয়। কাচ পরিষ্কারকরণে এমন একটি পরিষ্কারক পদার্থ ব্যবহার করতে হবে যা তেল, চর্বি বা গ্রিজের সাথে বিক্রিয়া করে কিন্তু কাচের উপাদান সোডিয়াম সিলিকেট বা ক্যালসিয়াম সিলিকেট এর সাথে বিক্রিয়া করে না। সাধারণত অ্যামোনিয়া গ্যাসকে পানিতে দ্রবীভূত করে তৈরিকৃত অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড \((NH_4OH)\) এর সাথে আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল, \(CH_3CH(OH)CH_3\) মিশিয়ে গ্লাস ক্লিনার প্রস্তুত করা হয়। অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইডকে অ্যামোনিয়া দ্রবণ বলেও উল্লেখ করা হয়।

কাচের উপরিভাগে লেগে থাকা ধুলাবালি, ময়লা, তেল, চর্বি বা গ্রিজ ইত্যাদি পরিষ্কারের জন্য যে পরিষ্কারক ব্যবহার করা হয় তাকে গ্লাস ক্লিনার বলে। গ্লাস ক্লিনারের প্রধান উপাদান অ্যামোনিয়া দ্রবণ বা অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড।

➤ গ্লাস ক্লিনার দ্বারা কাচ পরিষ্কার করার কৌশল: গ্লাস ক্লিনারকে যখন কাচের গায়ে দেওয়া হয় তখন \(NH_4OH\) কাচের তেল, চর্বি বা গ্রিজের সাথে বিক্রিয়া করে তেল বা চর্বি বা গ্রিজকে কাচ থেকে অপসারণ করে। যদি কাচের গায়ে কোনো জৈব পদার্থ লেগে থাকে তবে আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল সেই জৈব পদার্থকে দ্রবীভূত করে জৈব পদার্থকে কাচ থেকে অপসারিত করে। গ্লাস ক্লিনার দিয়ে যখন কাচ পরিষ্কার করা হয় তখন নাকে ও মুখে মাস্ক পরে নিতে হয়। কারণ গ্লাস ক্লিনারের মধ্যে অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড থাকে সেই অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড গ্যাস বের হয়ে নাকে ও মুখে যেতে পারে।

অ্যামোনিয়া গ্যাসের গবেষণাগারে প্রস্তুতি: গবেষণাগারে সাধারণত দুইটি পদ্ধতিতে অ্যামোনিয়া গ্যাস প্রস্তুত করা হয়। গবেষণাগারে একটি টেস্টটিউবে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড (\(NH_4Cl\)) এবং ক্যালসিয়াম অক্সাইড (\(CaO\)) মিশিয়ে উত্তপ্ত করে অ্যামোনিয়া উৎপন্ন করা হয়।
\[2NH_4Cl + CaO \longrightarrow 2NH_3 + CaCl_2 + H_2O\]

অথবা গবেষণাগারে একটি টেস্টটিউবে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড এবং কলিচুন \(Ca(OH)_2\) মিশিয়ে উত্তপ্ত করলে অ্যামোনিয়া গ্যাস, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড এবং পানি উৎপন্ন হয়।

\[2NH_4Cl(s) + Ca(OH)_2 \xrightarrow{\Delta} 2NH_3 + CaCl_2 + 2H_2O\]



চিত্র: অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রস্তুতি

শিল্পকারখানায় অ্যামোনিয়া গ্যাস প্রস্তুতি: ইউরিয়া সার প্রস্তুতির প্রধান উপাদান হচ্ছে অ্যামোনিয়া গ্যাস। শিল্পকারখানায় হেবার পদ্ধতিতে অ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপাদন করা যায়। হেবার পদ্ধতিতে \(N_2\) এবং \(H_2\) গ্যাস 1:3 অনুপাতে মিশ্রিত করে এর মধ্যে \(Fe\) প্রভাবক যোগ করে যদি মিশ্রণকে 450-550°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয় তবে \(NH_3\) গ্যাস উৎপন্ন হয়। (1:3 অনুপাতে \(N_2\) ও \(H_2\) দ্বারা বোঝায় \(N_2\) যত লিটার নেওয়া হবে তার 3 গুণ \(H_2\) নেওয়া হবে।) \(NH_3\) গ্যাস উৎপাদনের সময় কিছু তাপ উৎপন্ন হয়। এই বিক্রিয়াটি উভমুখী বিক্রিয়া। একদিকে \(N_2\) এবং \(H_2\) বিক্রিয়া করে \(NH_3\) তৈরি হয়, অপরদিকে কিছু \(NH_3\) গ্যাস ভেঙে \(N_2\) এবং \(H_2\) গ্যাসে পরিণত হয়। এই বিক্রিয়ায় উভয় তীর চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
\[N_2(g) + 3H_2(g) [200-250 \text{ atm}]{450^\circ\text{C}-550^\circ\text{C}, \text{ Fe}} \arrow 2NH_3 + 92 \text{ kJ}\]

প্রসাধনী ব্যবহার: মানুষ ত্বক পরিষ্কার করতে, ত্বকের সৌন্দর্য রক্ষায়, চুল পরিষ্কার করতে এবং বিভিন্ন কাজে প্রসাধনী (সাবান, ক্রিম, শ্যাম্পু) ব্যবহার করে। মানুষের ত্বকের pH 4.8 থেকে 5.5 এর মধ্যে। অর্থাৎ ত্বক অম্লীয় প্রকৃতির যা ত্বকে জীবাণুর আক্রমণ বা বংশবৃদ্ধি প্রতিরোধ করে। কাজেই প্রসাধনীর pH 4.8 থেকে 5.5 এর বেশি থাকলে সেই প্রসাধনী ব্যবহারের কারণে ত্বকের স্বাভাবিক অম্লত্ব কমে যাবে, যার কারণে ত্বকের সৌন্দর্য নষ্ট হবে এবং জীবাণু থেকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে। তাই প্রসাধনীর pH এবং ত্বকের pH এর সামঞ্জস্য থাকতে হয়।
➢
অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরীক্ষাগারে প্রস্তুতি: পরীক্ষাগারে সাধারণত দুইটি পদ্ধতিতে অ্যামোনিয়া গ্যাস প্রস্তুত করা হয়। পরীক্ষাগারে একটি টেস্টটিউবে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড (\(\text{NH}_4\text{Cl}\)) এবং ক্যালসিয়াম অক্সাইড (\(\text{CaO}\)) মিশিয়ে উত্তপ্ত করে অ্যামোনিয়া উৎপন্ন করা হয়।
$$2\text{NH}_4\text{Cl} + \text{CaO} \longrightarrow 2\text{NH}_3 + \text{CaCl}_2 + \text{H}_2\text{O}$$
অথবা পরীক্ষাগারে একটি টেস্টটিউবে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড এবং কলিচুন \(\text{Ca(OH)}_2\) মিশিয়ে উত্তপ্ত করলে অ্যামোনিয়া গ্যাস, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড এবং পানি উৎপন্ন হয়।
$$2\text{NH}_4\text{Cl(s)} + \text{Ca(OH)}_2 \xrightarrow{\Delta} 2\text{NH}_3 + \text{CaCl}_2 + 2\text{H}_2\text{O}$$
অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রস্তুতি
চিত্র: অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রস্তুতি
➢
শিল্পকারখানার অ্যামোনিয়া গ্যাস প্রস্তুতি: ইউরিয়া সার প্রস্তুতির প্রধান উপাদান হচ্ছে অ্যামোনিয়া গ্যাস। শিল্পকারখানায় হেবার পদ্ধতিতে অ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপাদন করা যায়। হেবার পদ্ধতিতে \(\text{N}_2\) এবং \(\text{H}_2\) গ্যাস 1:3 অনুপাতে মিশ্রিত করে এর মধ্যে Fe প্রভাবক যোগ করে যদি মিশ্রণকে 450-550°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয় তবে \(\text{NH}_3\) গ্যাস উৎপন্ন হয়। (1:3 অনুপাতে \(\text{N}_2\) ও \(\text{H}_2\) দ্বারা বোঝায় \(\text{N}_2\) যত লিটার নেওয়া হবে তার 3 গুণ \(\text{H}_2\) নেওয়া হবে।) \(\text{NH}_3\) গ্যাস উৎপাদনের সময় কিছু তাপ উৎপন্ন হয়। এই বিক্রিয়াটি উভমুখী বিক্রিয়া। একদিকে \(\text{N}_2\) এবং \(\text{H}_2\) বিক্রিয়া করে \(\text{NH}_3\) তৈরি হয়, অপরদিকে কিছু \(\text{NH}_3\) গ্যাস ভেঙে \(\text{N}_2\) এবং \(\text{H}_2\) গ্যাসে পরিণত হয়। এই বিক্রিয়ায় উভমুখী তীর চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
$$\text{N}_2\text{(g)} + 3\text{H}_2\text{(g)} \mathrel{\mathop{\rightleftharpoons}^{\mathrm{Fe}}_{\substack{\mathrm{200-250~atm} \\ \mathrm{450^\circ C-550^\circ C}}}} 2\text{NH}_3 + 92~\mathrm{kj}$$
➢
প্রসাধনী ব্যবহার: মানুষ ত্বক পরিষ্কার করতে, ত্বকের সৌন্দর্য রক্ষায়, চুল পরিষ্কার করতে এবং বিভিন্ন কাজে প্রসাধনী (সাবান, ক্রিম, শ্যাম্পু) ব্যবহার করে। মানুষের ত্বকের pH 4.8 থেকে 5.5 এর মধ্যে। অর্থাৎ ত্বক অম্লীয় প্রকৃতির যা ত্বকে জীবাণুর আক্রমণ বা বংশবৃদ্ধি প্রতিরোধ করে। কাজেই প্রসাধনীর pH 4.8 থেকে 5.5 এর বেশি থাকলে সেই প্রসাধনী ব্যবহারের কারণে ত্বকের স্বাভাবিক অম্লত্ব কমে যাবে, যার কারণে ত্বকের সৌন্দর্য নষ্ট হবে এবং জীবাণু থেকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে। তাই প্রসাধনীর pH এবং ত্বকের pH এর সামঞ্জস্য থাকতে হয়।
কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে রসায়ন
নদীমাতৃক সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশ। কৃষিই এদেশের প্রধান চালিকাশক্তি। স্বভাবতই এদেশের মানুষ চাষাবাদের ওপর নির্ভরশীল। প্রান্তিক কৃষকগণ মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য শিল্পকারখানায় উৎপাদিত রাসায়নিক সার কৃষি জমিতে ব্যবহার করে থাকে। চুনাপাথর (\(CaCO_3\)) একটি মূল্যবান খনিজ সম্পদ। আমাদের দেশে সুনামগঞ্জ জেলায় এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রচুর চুনাপাথর পাওয়া যায়। চুনাপাথর দ্বারা অনেক পদার্থ তৈরি করা যায়। যেমন: সিমেন্ট তৈরি করার প্রধান উপাদান হিসেবে চুনাপাথর ব্যবহার করা হয়। কোনো কারণে মাটি যদি অম্লীয় হয় অর্থাৎ মাটিতে যদি \(H^+\) এর পরিমাণ বেড়ে যায় তবে মাটির অম্লত্ব কমানোর জন্য সেই মাটিতে চুনাপাথর প্রয়োগ করা হলে চুনাপাথর \(H^+\) এর সাথে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম আয়ন (\(Ca^{2+}\)), কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং পানি তৈরি করে। ফলে মাটির অম্লত্ব কমে যায়।
\[CaCO_3 + 2H^+ \longrightarrow Ca^{2+} + CO_2 + H_2O\]
⊃ইউরিয়া:

বাংলাদেশের কৃষিতে মূলত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক সালফেট এবং বরিক এসিড বা বোরন সার ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সার সাধারণত গাছপালার বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে থাকে। এ সারগুলোর কাজ, রাসায়নিক উপাদানের ঘাটতি পূরণ করা। আমাদের দেশে বহুল ব্যবহৃত সার হলো ইউরিয়া। এটি একটি মূল্যবান পদার্থ। উদ্ভিদের মৌলিক পুষ্টি উপাদানের মধ্যে নাইট্রোজেন একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কৃষক জমিতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি পূরণ করার জন্য ইউরিয়া সার ব্যবহার করে থাকে। ইউরিয়া সারে নাইট্রোজেনের শতকরা পরিমাণ প্রায় 46%।

➤ ইউরিয়া প্রস্তুতি: কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং অ্যামোনিয়া গ্যাসের মিশ্রণকে উচ্চ চাপে এবং 130°-150°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে প্রথমে অ্যামোনিয়াম কার্বামেট (\(\text{NH}_2\text{COONH}_4\)) উৎপন্ন হয়। পরবর্তীতে অ্যামোনিয়াম কার্বামেট ভেঙে ইউরিয়া (\(\text{NH}_2-\text{CO}-\text{NH}_2\)) প্রস্তুত হয় যা একটি জৈব যৌগ।
$$ \text{CO}_2 + 2\text{NH}_3 \xrightarrow{\Delta} \text{NH}_2\text{COONH}_4 $$ $$ \text{NH}_2\text{COONH}_4 \longrightarrow \text{NH}_2-\text{CO}-\text{NH}_2 + \text{H}_2\text{O} $$

শিল্পক্ষেত্রে এবং কৃষিক্ষেত্রে ইউরিয়ার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। শিল্পক্ষেত্রে ইউরিয়া থেকে ম্যালামাইন পলিমার তৈরি করা হয়। কৃষিক্ষেত্রে ইউরিয়াকে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জমিতে ইউরিয়া সার দেওয়া হয় যাতে গাছ ইউরিয়া সার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে। উদ্ভিদ সরাসরি \(\text{N}_2\) গ্রহণ করে না। মাটিতে উপস্থিত ইউরিয়েজ নামক এক প্রকার এনজাইম ইউরিয়াকে ধীরে ধীরে বিয়োজিত করে অ্যামোনিয়া ও কার্বন ডাইঅক্সাইডে পরিণত করে। পরবর্তীতে উৎপন্ন অ্যামোনিয়া মাটিতে উপস্থিত পানিতে দ্রবীভূত হয়ে অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড উৎপন্ন করে। অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড মৃদু ক্ষার হওয়ায় পানিতে আংশিক বিয়োজিত হয়ে অ্যামোনিয়াম আয়ন উৎপন্ন করে। উদ্ভিদ অ্যামোনিয়াম আয়ন পুষ্টি উপাদান হিসেবে মূলের সাহায্যে শোষণ করে।

$$ \text{NH}_2-\text{CO}-\text{NH}_2 + \text{H}_2\text{O} \xrightarrow{\text{ইউরিয়েজ এনজাইম}} 2\text{NH}_3 + \text{CO}_2 $$ $$ \text{NH}_3 + \text{H}_2\text{O} \rightleftharpoons \text{NH}_4\text{OH} $$ $$ \text{NH}_4\text{OH} \rightleftharpoons \text{NH}_4^+ + \text{OH}^- $$
➤ নাইট্রোজেনের অভাবজনিত লক্ষণ: মাটিতে নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি বা অভাব দেখা দিলে ক্লোরোফিল সংশ্লেষণের হার অনেকাংশে কমে যায়। ফলে গাছ তার স্বাভাবিক সবুজ রং হারিয়ে ফেলে। এছাড়াও পাতার আকার ছোট হয়ে শাখা প্রশাখার বৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে গাছ খাটো হয়ে যায়। পাতার অগ্রভাগ থেকে বিবর্ণতা শুরু হয় এবং বৃন্ত ও শাখা প্রশাখা সরু হয়ে যায়। গোলাপি অথবা হালকা লাল রঙের অস্বাভাবিক বৃন্ত হয়। পুরাতন পাতার মধ্যশিরার শীর্ষভাগ হলুদাভ-বাদামি বর্ণ ধারণ করে পাতা অকালেই ঝরে পড়ে। ফুল ও ফলের আকার কিছুটা ছোট হয়ে ফলন কমে যায়।
ইউরিয়া সারের কাজ
০১ ইউরিয়া সার নাইট্রোজেন সরবরাহ করে থাকে যা শিকড়ের বৃদ্ধি বিস্তারে সহায়তা করে থাকে।
০২ গাছের ও শাকসবজির পর্যাপ্ত পরিমাণ পাতা, ডালপালা ও কান্ড উৎপাদনে সাহায্য করে থাকে।
০৩ ইউরিয়া সার ক্লোরোফিল উৎপাদনের মাধ্যমে গাছপালাকে গাঢ় সবুজ বর্ণ প্রদান করে থাকে।
০৪ কৃষি উৎপাদনসহ ফলের আকার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
০৫ উদ্ভিদের শর্করা ও প্রোটিন উৎপাদনে সহায়তা করে থাকে।

➲ অ্যামোনিয়াম সালফেট:

মাটিতে মূলত নানা ধরনের খনিজ পদার্থ বিদ্যমান। এইসব খনিজ পদার্থের পরিমাণের ওপর মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারকত্ব নির্ভর করে। সাধারণত ঠাণ্ডা ও শুষ্ক পরিবেশে মাটি ক্ষারীয় প্রকৃতির হয়। মাটির ক্ষারকত্ব বেশি হলে তা অ্যামোনিয়াম সালফেট প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

[এখানে অ্যামোনিয়াম সালফেট সারের ছবি যুক্ত করুন]
চিত্র: অ্যামোনিয়াম সালফেট সার

➤ অ্যামোনিয়াম সালফেট প্রস্তুতি: অ্যামোনিয়া এবং সালফিউরিক এসিড বিক্রিয়া করে অ্যামোনিয়াম সালফেট \([(\text{NH}_4)_2\text{SO}_4]\) এবং পানি উৎপন্ন হয়।

$$2\text{NH}_3 + \text{H}_2\text{SO}_4 \longrightarrow (\text{NH}_4)_2\text{SO}_4 + \text{H}_2\text{O}$$

➤ অ্যামোনিয়াম সালফেটের ব্যবহার: কৃষিক্ষেত্রে অ্যামোনিয়াম সালফেট এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। আমরা সাধারণত কৃষিকাজে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য রাসায়নিক সার প্রয়োগ করি। রাসায়নিক সারগুলোতে উদ্ভিদের মুখ্য পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান থাকে। এছাড়া মাটির pH নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হয়। মাটির pH মান 7 এর চেয়ে বেশি হলে মাটি ক্ষারীয় হয়। ক্ষারীয় মাটিতে ভাল ফসল উৎপাদন হয় না। অ্যামোনিয়াম সালফেট \(((\text{NH}_4)_2\text{SO}_4)\) অম্লীয় সার। এই সার মাটিতে দিলে মাটির pH নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। অ্যামোনিয়াম সালফেটে উদ্ভিদের মুখ্য পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন ও সালফার উপস্থিত থাকে, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ঘটাতে সহায়তা করে। এই সার থেকে উদ্ভিদ প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন ও সালফার উভয় উপাদানই গ্রহণ করে। এই জন্য কৃষি ক্ষেত্রে অ্যামোনিয়াম সালফেট সার ব্যবহার করা হয়।

➲ কৃষিদব্য প্রক্রিয়াকরণে রাসায়নিক দ্রব্য:

অধিকাংশ ভোক্তাই সবচেয়ে তাজা ফল এবং সবজি খেতে চায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সকল বিচিত্র রকমের ফল ও সবজি বছরব্যাপী উৎপাদন করা যায় না। ফলে এসব খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজন দেখা দেয়। প্রক্রিয়াজাতকরণ হচ্ছে এমন একটি বিজ্ঞান, যার মাধ্যমে পুষ্টি ও অন্যান্য গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ রেখে খাদ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করা হয়। ফলমূল, শাকসবজি, মাছ ইত্যাদিকে কৃষিদব্য বলা হয়।

[এখানে আমের ছবি যুক্ত করুন]
📝 যে প্রক্রিয়ায় কোনো রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে কোনো কৃষিজাত দ্রব্যকে দীর্ঘদিন ভালো রাখা বা পচনের হাত থেকে রক্ষা করা হয় সেই প্রক্রিয়াকে কৃষিদব্য প্রক্রিয়াকরণ বলা হয়।

রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের ভালো এবং খারাপ উভয় দিকই রয়েছে। আম, কলা ইত্যাদি ফল যখন পরিপক্ব হয় তখন এসকল ফলে প্রাকৃতিকভাবেই ইথিলিন গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই ইথিলিন গ্যাসের প্রভাবেই ফল পাকে। যদি এসকল অপরিপক্ব ফলে কৃত্রিমভাবে ইথিলিন গ্যাস প্রয়োগ করা হয়, তবে ফল পেকে যায়। আবার, ক্যালসিয়াম কার্বাইড \((\text{CaC}_2)\) এর মধ্যে পানি যোগ করে ইথিলিন গ্যাস তৈরি করা হয়।

$$\text{CaC}_2 + 2\text{H}_2\text{O} \longrightarrow \text{C}_2\text{H}_2 + \text{Ca(OH)}_2$$

কার্বাইড দিয়ে আম পাকানো বলতে ইথিলিন দ্বারা আম পাকানো পদ্ধতিকেই বোঝানো হয়। ইথিলিনকে আবার কার্বাইড গ্যাস বলা হয়। কার্বাইডের উপর নির্ভর করে ফল পাকলে...

➤ কৃষিদব্য সংরক্ষণে রাসায়নিক দ্রব্য: ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে নানা ধরনের খাদ্য দ্রব্য সংরক্ষণের প্রয়োজন দেখা দেয়। কৃষিদব্য যাতে দুর্গন্ধ না হয় বা যাতে এগুলোতে পচন না ধরে সেজন্য বরফ, খাদ্য লবণ, ভিনেগার ইত্যাদি দ্বারা কৃষিদব্য সংরক্ষণ করা হয়। বরফ দ্বারা মাছ সংরক্ষণ করা হয়। টমেটো, কাঁচা আম ইত্যাদি কৌটাতে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য ভিনেগার ব্যবহৃত হয়। খাদ্যের সাথে আমাদের শরীরে ভিনেগার প্রবেশ করলেও আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। ফরমালিন দ্বারা খাদ্য সংরক্ষণ করা হয় না। কারণ ফরমালিন মানুষ এবং প্রাণী সকলের জন্য বিষাক্ত পদার্থ। আমাদের শরীরে ফরমালিন প্রবেশ করলে আমাদের মৃত্যুর কারণও হতে পারে। অতএব, ফরমালিন দ্বারা কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করা উচিত না।

➲ কয়েকটি অনুমোদিত ফুড প্রিজারভেটিভ:

যেসব ফুড প্রিজারভেটিভ আমাদের শরীরে গেলে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না এবং সেগুলোকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা খাদ্য সংরক্ষক হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে সেসব ফুড প্রিজারভেটিভকে অনুমোদিত ফুড প্রিজারভেটিভ বলা হয়। যেসব ফুড প্রিজারভেটিভ আমাদের শরীরে গেলে আমাদের শরীরের ক্ষতি হয় সেগুলোকে অননুমোদিত ফুড প্রিজারভেটিভ বলা হয়। সোডিয়াম বেনজয়েট, বেনজোয়িক এসিড, ভিনেগার, লবণের দ্রবণ, চিনির দ্রবণ ইত্যাদি অনুমোদিত ফুড প্রিজারভেটিভ। ইথিলিন, অ্যাসিটিলিন ইত্যাদি অননুমোদিত ফুড প্রিজারভেটিভ।

[এখানে সংরক্ষিত খাদ্যের ছবি যুক্ত করুন]
📝 যেসব রাসায়নিক দ্রব্য খাদ্যসামগ্রীতে দিলে খাদ্যসামগ্রীতে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে না, দুর্গন্ধ হয় না, পচন হয় না সেসব রাসায়নিক দ্রব্যকে ফুড প্রিজারভেটিভ বলে।
ফুড
প্রিজারভেটিভ
প্রাকৃতিক
প্রিজারভেটিভ
লবণের দ্রবণ, চিনির দ্রবণ, ভিনেগার
কৃত্রিম
প্রিজারভেটিভ
সোডিয়াম বেনজয়েট, বেনজোয়িক এসিড, প্রোপানয়িক এসিড
💡 জেনে রাখো

ফুড লিকার হচ্ছে এমন এক ধরনের জৈব পদার্থ যা খাদ্য সংরক্ষণকারী পাত্রের গায়ে প্রলেপন আকারে দেওয়া হয় যেন খাদ্য ও পাত্রের ধাতব পদার্থের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখে যাতে তারা পরস্পর সান্নিধ্যে না আসে এবং কোনো ধাতব কণা খাদ্যে না মিশে যায়। এ ফুড লিকার ফলমূল ও সবজি সংরক্ষণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
শিল্প বর্জ্য ও পরিবেশ দূষণ

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। ফলে দেশে বর্ধিত জনসংখ্যার সঙ্গে সমান তালে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্পকারখানা। প্রতিটি শিল্পকারখানা বিভিন্নভাবে দূষিত করছে মাটি, পানি, বায়ু, নদীসহ ভূগর্ভস্থ পানি। বর্তমানে বুড়িগঙ্গা নদীর পাশে গড়ে ওঠা হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য, শ্যামপুরের ডাইং কারখানার বিষাক্ত পানি ও সদরঘাটের নৌযান থেকে নির্গত দূষণের কারণে বুড়িগঙ্গা আজ নর্দমায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে চামড়া শিল্প, রং শিল্প, কীটনাশক শিল্প থেকে বর্জ্য হিসেবে বিভিন্ন প্রকার ভারী ধাতু যেমন: ক্রোমিয়াম \( (Cr) \), লেড \( (Pb) \), মার্কারি \( (Hg) \) এবং ক্যাডমিয়াম \( (Cd) \) ইত্যাদি নির্গত হয়। এসব ভারী ধাতু বা বর্জ্য পদার্থ মাটি এবং পানিতে প্রবেশ করে। এসব মাটিতে যেসব উদ্ভিদ জন্মে সেসব উদ্ভিদের মধ্যে এসব ধাতু প্রবেশ করে। এসব উদ্ভিদের ফলমূল খেলে আমাদের শরীরে এসব ভারী ধাতু প্রবেশ করে আমাদের কিডনি ও লিভারের ক্ষতি করে এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে। আবার সাবান ও ডিটারজেন্ট কারখানা থেকে প্রচুর পরিমাণে কস্টিক সোডা \( (NaOH) \) মাটি এবং পানিতে নির্গত হয়। পানিতে \( NaOH \) গেলে পানিতে ক্ষারকের মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে পানিতে জলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদ ভালোভাবে বাঁচতে পারে না।

Post a Comment

Previous Post Next Post